আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী(Abdul Gaffar Chowdhury)
প্রথম পাতা » জীবনী » আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী(Abdul Gaffar Chowdhury)বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ইতিহাসে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এক উজ্জ্বল ও অনন্য নাম। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং মুক্তচিন্তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। বাংলা ভাষা আন্দোলনের অবিস্মরণীয় গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”-এর গীতিকার হিসেবে তিনি সর্বাধিক পরিচিত। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও আত্মত্যাগকে ধারণ করা এই গান কেবল একটি সংগীত নয়, বরং বাঙালি জাতিসত্তা, ভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক অমর প্রতীক হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সাহিত্য ও সাংবাদিকতা জীবনে তিনি দেশ, সমাজ, রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গ্রামে। তাঁর পিতা হাজি ওয়াহিদ রেজা চৌধুরী ছিলেন বরিশাল জেলা কংগ্রেসের সভাপতি এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার পরিবেশে বেড়ে ওঠা গাফ্ফার চৌধুরীর চিন্তাজগৎ শৈশব থেকেই প্রগতিশীল ও মানবিক আদর্শে প্রভাবিত হয়।
শিক্ষাজীবনে তিনি সাহিত্য ও রাজনীতির প্রতি গভীর আগ্রহ দেখান। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে তাঁর পেশাগত ও সৃজনশীল জীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয় ১৯৫০ সালে দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায়। পরবর্তীকালে তিনি সংবাদ, ইত্তেফাক, আজাদসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রে কাজ করেন। তাঁর লেখনী ছিল তীক্ষ্ণ, বিশ্লেষণধর্মী এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে গভীরভাবে অনুধাবনকারী।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক জয় বাংলা-এর প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন ও আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে সাংবাদিকতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর নাম উচ্চারিত হলেই স্মরণে আসে বাংলা ভাষা আন্দোলনের অমর সংগীত— “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে রচিত এই গানটি প্রথমে তিনি নিজেই সুরারোপ করেন। পরে সুরকার ও শহীদ ভাষাসৈনিক আলতাফ মাহমুদ গানটিতে নতুন সুর সংযোজন করেন, যা পরবর্তীকালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
এই গানটি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের প্রতীক এবং প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদদের স্মরণে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পরিবেশিত হয়। এটি শুধু সংগীত নয়, বরং ভাষার অধিকারের জন্য আত্মত্যাগের এক ঐতিহাসিক দলিল।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ছিলেন একজন শক্তিশালী সাহিত্যিক। উপন্যাস, গল্প, নাটক, স্মৃতিকথা ও রাজনৈতিক প্রবন্ধ মিলিয়ে তিনি ত্রিশেরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর লেখায় সমাজবাস্তবতা, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, মানবিকতা এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান, ধীরে বহে বুড়িগঙ্গাসহ বিভিন্ন উপন্যাস ও স্মৃতিকথা। তাঁর সাহিত্যকর্মে ইতিহাস ও সমকালীন বাস্তবতার এক আন্তরিক ও বিশ্লেষণধর্মী উপস্থাপন লক্ষ করা যায়।
১৯৭৪ সালে স্ত্রীর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে তিনি যুক্তরাজ্যে যান এবং পরবর্তীকালে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। প্রবাসজীবনেও তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি অব্যাহত রাখেন। লন্ডন থেকে প্রকাশিত নতুন দিন পত্রিকা পরিচালনার মাধ্যমে তিনি প্রবাসী বাংলা সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন।
তাঁর রাজনৈতিক কলামগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পাঠকমহলে সমাদৃত ছিল। স্পষ্টভাষী রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে তিনি সমসাময়িক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিষয় নিয়ে নির্ভীক মতামত প্রকাশ করেছেন।
সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বহু সম্মাননা লাভ করেন। তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৭), একুশে পদক, **স্বাধীনতা পদক (২০০৯)**সহ একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অবদান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রশংসিত হয়েছে।
২০২২ সালের ১৯ মে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের বার্নেট হাসপাতালে ৮৮ বছর বয়সে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীকালে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে আনা হয় এবং ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী কেবল একজন সাংবাদিক বা সাহিত্যিক নন; তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনার এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তাঁর লেখা, চিন্তা ও আদর্শ আজও বাঙালির জাতীয় স্মৃতি, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চেতনায় গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।
