আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ (Abdullah Abu Sayeed)

প্রথম পাতা » জীবনী » আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ (Abdullah Abu Sayeed)


আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

বাংলাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজসংস্কারের ইতিহাসে এক অনন্য নাম আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সমাজসংস্কারক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব এবং পাঠাভ্যাস আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কেবল শিক্ষকতা ও সাহিত্যচর্চায় নয়, বরং একটি আলোকিত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেও বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বাংলাদেশের পাঠসংস্কৃতি বিকাশে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। শিক্ষা ও মানবিক চেতনা প্রসারে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশে ব্যাপক সম্মান ও স্বীকৃতি লাভ করেন।

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৫ জুলাই কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায়। যদিও তাঁর জন্ম কলকাতায়, তাঁর পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার কামারগাতি গ্রামে। তাঁর পিতা আযীমউদ্দীন আহমদ ছিলেন একজন খ্যাতিমান শিক্ষক, সাহিত্যপ্রেমী ও নাট্যকার, যার প্রভাব শৈশব থেকেই তাঁর চিন্তা ও মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও অধ্যয়নমনস্ক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজভাবনায় তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়, যা পরবর্তীকালে তাঁর বহুমাত্রিক কর্মজীবনের ভিত্তি স্থাপন করে।

১৯৬১ সালে মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের কর্মজীবনের সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী—শুধু পাঠ্যবইয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তচিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ ও জ্ঞানান্বেষণের আগ্রহ সৃষ্টি করতেন।

ষাটের দশকে তিনি ‘কণ্ঠস্বর’ সাহিত্যপত্র সম্পাদনার মাধ্যমে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে নতুন চিন্তাধারার উন্মেষ ঘটান। পাশাপাশি সত্তরের দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘সপ্তবর্ণ’, ‘ঈদ আনন্দমেলা’-সহ বিভিন্ন জনপ্রিয় অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

১৯৭৮ সালে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ মানবিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। “আলোকিত মানুষ চাই” স্লোগানকে সামনে রেখে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান বইপড়া, জ্ঞানচর্চা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের মাধ্যমে একটি সচেতন ও আলোকিত সমাজ নির্মাণে কাজ করে যাচ্ছে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্র, বইপড়া কর্মসূচি এবং ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার কার্যক্রম দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লাখো শিক্ষার্থী ও পাঠকের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বলা হয়, বাংলাদেশের পাঠসংস্কৃতির বিকাশে এ প্রতিষ্ঠান এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে।

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ সাহিত্যচর্চায়ও সমানভাবে সক্রিয়। প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, কবিতা, অনুবাদ ও আত্মউন্নয়নমূলক রচনা মিলিয়ে তিনি পঞ্চাশেরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে— আমার বোকা শৈশব, ভাঙো দুর্দশার চক্র, স্বপ্নের সমান বড়, অন্তরঙ্গ আলাপ এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি।

তাঁর লেখায় মানবিকতা, আত্মবিকাশ, শিক্ষা, ইতিবাচক চিন্তা ও সমাজগঠনের দর্শন প্রতিফলিত হয়। তিনি বিশ্বাস করেন—একজন মানুষ বই পড়ার মাধ্যমে নিজেকে উন্নত করতে পারে এবং সমাজকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়।

শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজসংস্কারে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক এবং আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার লাভ করেন। বিশেষত পাঠাভ্যাস ও মানবিক সমাজ নির্মাণে তাঁর অসাধারণ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে।

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বাংলাদেশের পাঠসংস্কৃতির এক নীরব বিপ্লবী হিসেবে পরিচিত। তাঁর চিন্তা, কর্ম ও দর্শন দেশের শিক্ষা, সাহিত্য এবং নাগরিক সমাজে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করেছে। আশির কোঠা পেরিয়েও তিনি বই, চিন্তা, লেখালেখি ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন। তাঁর বহুল উদ্ধৃত দর্শন— “মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়”—আজও তরুণ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে ও আত্মোন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ