সাহাবুদ্দিন আহমদ (Shahabuddin Ahmed)
প্রথম পাতা » জীবনী » সাহাবুদ্দিন আহমদ (Shahabuddin Ahmed)বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০ – ১৯ মার্চ ২০২২) ছিলেন বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রজীবনের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন দেশের ৬ষ্ঠ প্রধান বিচারপতি, একজন প্রাজ্ঞ আইনবিদ এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে দু’বার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। প্রথমবার তিনি ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংকটময় সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন; দ্বিতীয়বার ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তাঁর সততা, নিরপেক্ষতা, সংযমী ব্যক্তিত্ব ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা তাঁকে দেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসে এক বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
সাহাবুদ্দিন আহমদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার পাইকুড়া ইউনিয়নের পেমই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা তালুকদার রিসাত আহমদ ছিলেন সমাজসেবী ও জনহিতৈষী ব্যক্তি। শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ তিনি নান্দাইলে তাঁর বোনের বাড়িতে কাটান। পারিবারিক পরিবেশে শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাঁর সহধর্মিণী আনোয়ারা আহমদ ২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে বড় মেয়ে অধ্যাপক ড. সিতারা পারভীন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক; তিনি ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। অন্য সন্তানদের মধ্যে শাহানা স্মিথ, সামিয়া পারভীন, শিবলী আহমদ ও সোহেল আহমদ নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।
সাহাবুদ্দিন আহমদ ১৯৪৫ সালে নান্দাইলের চন্ডীপাশা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর ১৯৪৮ সালে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে আইএ সম্পন্ন করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫১ সালে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৫২ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (সিএসপি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জনপ্রশাসন বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণও লাভ করেন। এই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা, বিশ্লেষণী মনন এবং রাষ্ট্রবিষয়ক বোধকে সমৃদ্ধ করে।
সাহাবুদ্দিন আহমদের কর্মজীবনের সূচনা হয় ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে। পরে তিনি গোপালগঞ্জ ও নাটোরে মহকুমা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সহকারী জেলা প্রশাসক হিসেবেও কাজ করেন। তবে তাঁর কর্মজীবনের প্রধান পরিচয় নির্মিত হয় বিচার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে। ১৯৬০ সালে তিনি প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগে বদলি হন এবং দ্রুতই বিচারিক দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও প্রজ্ঞার জন্য পরিচিতি লাভ করেন।
তিনি ঢাকা ও বরিশালে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার নিযুক্ত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৭৩-৭৪ সালে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি নিযুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে দেশের বিচারব্যবস্থার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে যান।
তাঁর বহু রায় ঢাকা ল রিপোর্ট, বাংলাদেশ লিগ্যাল ডিসিশনস ও বাংলাদেশ কেস রিপোর্টসে প্রকাশিত হয়েছে। চাকরিসংক্রান্ত বিরোধ, নির্বাচন-সংক্রান্ত মামলা, শ্রম ব্যবস্থাপনা এবং সাংবিধানিক প্রশ্নে তাঁর রায়গুলো বিচারব্যবস্থায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। বিশেষ করে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী সম্পর্কিত মামলায় তাঁর রায়কে যুগান্তকারী বলে বিবেচনা করা হয়, যা বাংলাদেশের সংবিধান-ব্যাখ্যা ও সাংবিধানিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী ঘটনার তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাহাবুদ্দিন আহমদের নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয় ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংকটময় সময়ে। ৫ ডিসেম্বর ১৯৯০ উপ-রাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমদের পদত্যাগের পর তিনি উপ-রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে আসীন হন। পরদিন, ৬ ডিসেম্বর, সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের পর দেশে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যখন ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারছিল না, তখন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নামই সকল পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দেশকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে এগিয়ে নেন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে পুনরায় বিচার বিভাগে ফিরে যান এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময়কার তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
১৯৯৬ সালের ২৩ জুলাই সাহাবুদ্দিন আহমদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও, তিনি এই পদে থেকে সততা, প্রজ্ঞা ও নৈতিক দৃঢ়তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বকাল ছিল সংযম, ভারসাম্য ও সাংবিধানিক শালীনতার এক স্মরণীয় অধ্যায়।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে রাষ্ট্রের অভিভাবকসুলভ ভূমিকা পালনের চেষ্টা করেন। তাঁর আচরণ, বক্তব্য ও সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়েছে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবিধানিক প্রধানের মর্যাদা, নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য রক্ষার গভীর বোধ। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের সময়ে তিনি রাষ্ট্রপতি পদকে সংযম ও মর্যাদার সঙ্গে ধারণ করেছিলেন।
রাষ্ট্রপতি থাকাকালে সাহাবুদ্দিন আহমদ নিজের স্বাধীন অবস্থান ও সাংবিধানিক বিবেক বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। বিশেষত ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি জননিরাপত্তা আইন নামে একটি বিতর্কিত আইনে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব ও মতবিরোধ তৈরি হয়। তবে তিনি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক মর্যাদা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপস করেননি।
পরবর্তী সময়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান মন্তব্য করেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে সরকারি প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে চাওয়ার কারণেই তৎকালীন ক্ষমতাসীন মহলের একাংশ তাঁর প্রতি বিরূপ হয়েছিল। কিন্তু সাহাবুদ্দিন আহমদ দেশের কল্যাণের প্রশ্নে নিজের বিবেকসম্মত অবস্থান বজায় রেখেছিলেন—এটাই তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত চরিত্রের অন্যতম উজ্জ্বল দিক।
বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ ২০২২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ হারায় এক সৎ, সংযমী ও প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ককে, যিনি বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনা—উভয় ক্ষেত্রেই সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাঁকে বনানী কবরস্থানে তাঁর স্ত্রীর কবরের পাশে দাফন করা হয়।
বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসে এক বিরল মর্যাদার নাম। তিনি এমন এক সময়ে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যখন দেশ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল। বিচারক হিসেবে তাঁর নিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সংযম, এবং ব্যক্তি হিসেবে তাঁর সততা তাঁকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করেছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রজীবনে তিনি ছিলেন এক নীরব কিন্তু দৃঢ় উপস্থিতি—যিনি ক্ষমতার প্রদর্শনের চেয়ে দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদেও থেকে নির্লোভ, শালীন ও নীতিবান থাকা সম্ভব। সেই অর্থে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ কেবল একজন প্রধান বিচারপতি বা রাষ্ট্রপতি নন; তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
