আবুল ফজল(Abul Fazal)

প্রথম পাতা » জীবনী » আবুল ফজল(Abul Fazal)


আবুল ফজল(Abul Fazal)

বাংলা সাহিত্য, সমাজচিন্তা ও শিক্ষাজগতে যাঁদের অবদান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, তাঁদের অন্যতম হলেন আবুল ফজল। সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক হিসেবে তিনি যেমন খ্যাতি অর্জন করেছেন, তেমনি সমাজ, সংস্কৃতি ও মানবতাবাদ নিয়ে তাঁর প্রগতিশীল ও মুক্তবুদ্ধির চিন্তার জন্য পেয়েছেন “বাংলার বিবেক” উপাধি। দীর্ঘ কর্মময় জীবনে তিনি শিক্ষকতা, সাহিত্যচর্চা এবং শিক্ষা প্রশাসনের মাধ্যমে জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯০৩ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া গ্রামে এক ধর্মনিষ্ঠ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবুল ফজল। তাঁর পিতা ছিলেন মৌলবি ফজলুর রহমান। পারিবারিক ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা আবুল ফজল প্রথমে মক্তব ও মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবন শুরু করেন। তবে সময়ের সঙ্গে তিনি আধুনিক শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং নানা বাধা অতিক্রম করে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যান। ১৯২৮ সালে University of Dhaka থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৪০ সালে University of Calcutta থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ সম্পন্ন করেন। বাংলা সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ পরবর্তীকালে তাঁকে এক অনন্য চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

সাহিত্যজীবনের শুরুতে আবুল ফজল গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর লেখনীতে সমাজবাস্তবতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সময়ের সংকট গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। “চৌচির”, “রাঙ্গা প্রভাত”, “সাহসিকা” ও “মাটির পৃথিবী” তাঁর উল্লেখযোগ্য কথাসাহিত্যকর্ম। তবে প্রাবন্ধিক হিসেবেই তিনি বিশেষভাবে সমাদৃত। “সাহিত্য সংস্কৃতি ও জীবন”, “সমাজ সাহিত্য ও রাষ্ট্র” এবং “মানবতন্ত্র” প্রবন্ধগ্রন্থে তিনি সমাজ, রাষ্ট্র, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। তাঁর রচনায় উদার মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও যুক্তিবাদী দর্শনের সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।

কর্মজীবনে আবুল ফজল বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা দিয়ে যাত্রা শুরু করেন এবং পরে চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত University of Chittagong-এর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবেও তিনি দেশের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষানীতিতে ভূমিকা রাখেন।

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গেও আবুল ফজল ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। “একুশ মানে মাথা নত না করা”—এই বিখ্যাত উক্তি ভাষা আন্দোলনের চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং প্রতিরোধমূলক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন।

সাহিত্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অর্জন করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার এবং দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পদক। তাঁর পুত্র আবুল মোমেন সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে পারিবারিক বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন।

১৯৮৩ সালের ৪ মে চট্টগ্রামে তাঁর জীবনাবসান হলেও আবুল ফজলের চিন্তা ও সাহিত্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। মুক্তবুদ্ধি, মানবিক মূল্যবোধ ও যুক্তিনির্ভর সমাজ গঠনের স্বপ্নে তিনি আজও এক অনুপ্রেরণার নাম। বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় তাঁর অবদান তাঁকে চিরকাল স্মরণীয় করে রাখবে।




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ